ডায়াবেটিস: কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ডায়াবেটিস (Diabetes Mellitus) হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীর রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আমাদের শরীরে অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে উৎপন্ন ইনসুলিন হরমোন গ্লুকোজকে কোষে পৌঁছে দিয়ে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। যখন ইনসুলিন কম উৎপন্ন হয় বা শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই ডায়াবেটিস বলা হয়।
ডায়াবেটিস কেন হয়?
ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন:
• পারিবারিক ইতিহাস (বংশগত কারণ)
• অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
• শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
• অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
• বয়স বৃদ্ধি
• উচ্চ রক্তচাপ
• অতিরিক্ত মানসিক চাপ
• গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ইতিহাস
ডায়াবেটিসের প্রধান ধরন
টাইপ-১ ডায়াবেটিস
এ ক্ষেত্রে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। সাধারণত শিশু বা তরুণ বয়সে শুরু হয়। রোগীকে নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস
সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এই ধরনের ডায়াবেটিস। শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না অথবা পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না। সাধারণত ৩০ বছরের বেশি বয়সে বেশি দেখা যায়, তবে বর্তমানে কম বয়সীদের মধ্যেও বাড়ছে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
গর্ভাবস্থায় কিছু নারীর ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পর এটি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ডায়াবেটিসের লক্ষণ
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
• বারবার প্রস্রাব হওয়া
• অতিরিক্ত পিপাসা লাগা
• বেশি ক্ষুধা লাগা
• ওজন কমে যাওয়া
• দুর্বলতা ও ক্লান্তি
• ঝাপসা দেখা
• ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
• ত্বকে চুলকানি
• বারবার সংক্রমণ হওয়া
• হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব
তবে অনেক ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই ডায়াবেটিস ধরা পড়ে।
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পরীক্ষা
খালি পেটে রক্তে শর্করা (Fasting Blood Sugar)
স্বাভাবিক: ৭০–৯৯ mg/dL
প্রিডায়াবেটিস: ১০০–১২৫ mg/dL
ডায়াবেটিস: ১২৬ mg/dL বা তার বেশি
খাবারের ২ ঘণ্টা পর (Postprandial Blood Sugar)
স্বাভাবিক: ১৪০ mg/dL এর নিচে
ডায়াবেটিস: ২০০ mg/dL বা তার বেশি
HbA1c পরীক্ষা
এই পরীক্ষার মাধ্যমে গত প্রায় ৩ মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা জানা যায়।
স্বাভাবিক: ৫.৭%-এর নিচে
প্রিডায়াবেটিস: ৫.৭%–৬.৪%
ডায়াবেটিস: ৬.৫% বা তার বেশি
ডায়াবেটিসের জটিলতা
নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ডায়াবেটিস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি জটিলতা
• রক্তে শর্করা খুব বেড়ে যাওয়া
• রক্তে শর্করা খুব কমে যাওয়া
• ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস
দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা
• হৃদরোগ
• স্ট্রোক
• কিডনি রোগ
• চোখের রেটিনার ক্ষতি
• স্নায়ুর ক্ষতি
• পায়ের ক্ষত ও সংক্রমণ
• যৌন সমস্যা
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্যাভ্যাস
যা বেশি খেতে পারেন
• শাকসবজি
• লাউ, করলা, পুঁইশাক, পালং শাক
• ডাল
• মাছ
• ডিম
• মুরগির মাংস (চর্বিহীন)
• পরিমিত ফল
• ওটস ও লাল চালের ভাত
যা সীমিত রাখতে হবে
• সাদা চাল বেশি পরিমাণে
• মিষ্টি
• কোমল পানীয়
• কেক, বিস্কুট, চকলেট
• ফাস্টফুড
• অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার
ডায়াবেটিস রোগীর ব্যায়াম
নিয়মিত ব্যায়াম রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
• প্রতিদিন ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা
• সাইকেল চালানো
• সাঁতার
• হালকা ব্যায়াম
• ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায়
যদিও সব ধরনের ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায় না, তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
• স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া
• নিয়মিত ব্যায়াম করা
• ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
• ধূমপান পরিহার করা
• পর্যাপ্ত ঘুমানো
• নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
ডায়াবেটিস রোগীর দৈনন্দিন করণীয়
১. নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা।
২. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করা।
৩. নির্দিষ্ট সময় মেনে খাবার খাওয়া।
৪. পায়ের যত্ন নেওয়া।
৫. বছরে অন্তত একবার চোখ ও কিডনি পরীক্ষা করা।
৬. রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
উপসংহার
ডায়াবেটিস একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, নিয়মিত পরীক্ষা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে একজন ডায়াবেটিস রোগী স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। ডায়াবেটিসকে ভয় না পেয়ে এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

0 Comments