হাসির গল্প: বুদ্ধিমান মজিদ আর গরুর বিচার
এক গ্রামে মজিদ নামে এক লোক থাকত। মজিদ খুব গরিব ছিল, কিন্তু নিজেকে সে গ্রামের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ মনে করত। তার একটা বিশেষ গুণ ছিল—যে কোনো সমস্যার সমাধান সে দিতে পারত। তবে সমস্যা হলো, তার দেওয়া সমাধান শুনে মানুষ সমস্যার চেয়ে বেশি হাসত!
একদিন সকালে মজিদ বাজারে যাওয়ার জন্য বের হলো। পথে সে দেখল, গ্রামের মাতবর করিম সাহেব খুব রাগী মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
মজিদ জিজ্ঞেস করল,
—“মাতবর সাহেব, আপনার মুখটা এমন কেন? মনে হচ্ছে কেউ আপনার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে পালিয়েছে!”
করিম সাহেব রেগে বললেন,
—“চুপ কর! আমার সবচেয়ে ভালো গরুটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”
মজিদ বলল,
—“এই তো সামান্য ব্যাপার! গরু খুঁজে পাওয়া আমার বাঁ হাতের কাজ।”
মাতবর অবাক হয়ে বললেন,
—“তুমি গরু খুঁজে বের করতে পারবে?”
—“অবশ্যই! তবে একটা শর্ত আছে।”
—“কী শর্ত?”
—“গরু পাওয়া গেলে আমাকে এক কেজি মিষ্টি দিতে হবে।”
মাতবর রাজি হয়ে গেলেন।
মজিদ গম্ভীর মুখে চারদিকে তাকাল। তারপর মাটিতে কিছুক্ষণ পায়ের ছাপ দেখার ভান করল। এরপর একটা ঝোপের কাছে গিয়ে কান পেতে দাঁড়াল।
মাতবর বললেন,
—“কী করছ?”
মজিদ ফিসফিস করে বলল,
—“গরুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছি।”
মাতবর চোখ বড় বড় করে বললেন,
—“গরুর সঙ্গে আবার টেলিফোনে কথা বলা যায় নাকি?”
মজিদ বলল,
—“আপনি চুপ থাকুন। গরু এখন খুব ব্যস্ত।”
মাতবর আর কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর মজিদ দৌড়ে এসে বলল,
—“পেয়ে গেছি! গরু পশ্চিম দিকে গেছে।”
মাতবর বললেন,
—“তুমি জানলে কীভাবে?”
মজিদ বুক ফুলিয়ে বলল,
—“গরুর পায়ের ছাপ পশ্চিম দিকে গেছে।”
মাতবর মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
—“এটা তো আমিও দেখতে পাচ্ছি!”
মজিদ হেসে বলল,
—“আপনি দেখতে পাচ্ছেন পায়ের ছাপ। আমি দেখছি গরুর ভবিষ্যৎ!”
দুজন পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে দেখা গেল, গরু একটা কলাগাছের পাশে দাঁড়িয়ে কলাপাতা খাচ্ছে।
মাতবর খুশি হয়ে বললেন,
—“আরে! সত্যিই তো গরু পাওয়া গেছে!”
মজিদ সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে বলল,
—“মিষ্টি দিন।”
মাতবর বললেন,
—“কিন্তু তুমি তো শুধু পায়ের ছাপ দেখে গরু খুঁজে পেয়েছ!”
মজিদ বলল,
—“তা ঠিক। কিন্তু পায়ের ছাপ দেখার জন্যও তো আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।”
মাতবর বাধ্য হয়ে তাকে এক কেজি মিষ্টি দিলেন।
মজিদ মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ভাবল, “আজ তো ভালোই আয় হলো!”
পরদিন গ্রামের আরেক লোক ছুটে এসে বলল,
—“মজিদ ভাই, আমার হাঁস হারিয়ে গেছে। একটু খুঁজে দেবেন?”
মজিদ বলল,
—“অবশ্যই। তবে এবার দুই কেজি মিষ্টি লাগবে।”
লোকটি রাজি হলো।
মজিদ চারদিকে খুঁজতে লাগল। অনেকক্ষণ পর সে একটা পুকুরের ধারে গিয়ে দেখল, কয়েকটা হাঁস পানিতে সাঁতার কাটছে।
সে ফিরে এসে বলল,
—“আপনার হাঁস পাওয়া গেছে।”
লোকটি দৌড়ে গিয়ে দেখে সত্যিই তার হাঁসগুলোর মধ্যে একটি তার নিজের হাঁস।
সে খুব খুশি হয়ে মজিদকে দুই কেজি মিষ্টি দিল।
এরপর থেকে গ্রামের সবাই মজিদের কাছে হারানো জিনিস খুঁজতে আসতে লাগল।
কারও ছাগল হারিয়েছে, কারও মুরগি, কারও জুতা, আবার কারও লাঠি।
মজিদ প্রত্যেকবারই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে চিন্তা করার ভান করত। তারপর বলত,
—“উত্তর পেয়েছি!”
একদিন গ্রামের চেয়ারম্যানের নতুন জুতা হারিয়ে গেল।
চেয়ারম্যান খুব রেগে গিয়ে বললেন,
—“মজিদ! আমার জুতা খুঁজে দাও। না হলে কিন্তু তোমার খবর আছে!”
মজিদ বলল,
—“চেয়ারম্যান সাহেব, জুতা খুঁজে দেওয়া সহজ। কিন্তু আজ আমার পারিশ্রমিক একটু বেশি।”
—“কত?”
—“পাঁচ কেজি মিষ্টি।”
চেয়ারম্যান বললেন,
—“ঠিক আছে। আগে জুতা খুঁজে দাও।”
মজিদ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বলল,
—“জুতাটা পূর্ব দিকে আছে।”
সবাই পূর্ব দিকে গেল।
কিছুদূর গিয়ে দেখা গেল, চেয়ারম্যানের জুতা একটা গাছের নিচে পড়ে আছে।
চেয়ারম্যান অবাক!
—“মজিদ, তুমি এত দ্রুত কীভাবে বুঝলে?”
মজিদ গম্ভীরভাবে বলল,
—“চেয়ারম্যান সাহেব, আপনার জুতার একটা গোপন বৈশিষ্ট্য আছে।”
—“কী বৈশিষ্ট্য?”
—“আপনার জুতা হাঁটতে পারে না। তাই কেউ যেখানে খুলে রেখেছে, সেখানেই পড়ে আছে!”
সবাই হেসে উঠল।
চেয়ারম্যানও হাসি থামাতে পারলেন না।
তবে মজিদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো কয়েক দিন পর।
গ্রামের স্কুলের শিক্ষক রহিম সাহেব ঘোষণা করলেন,
—“মজিদ, তুমি নিজেকে অনেক বুদ্ধিমান মনে করো। আজ তোমার পরীক্ষা নেব।”
মজিদ বলল,
—“নিন, আমি প্রস্তুত।”
শিক্ষক হাতে একটা ডিম নিয়ে বললেন,
—“বল তো, আমার হাতে কী আছে?”
মজিদ একটু চিন্তা করে বলল,
—“ডিম।”
শিক্ষক অবাক হয়ে বললেন,
—“কীভাবে বুঝলে?”
মজিদ বলল,
—“আপনি ডিম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।”
শিক্ষক বললেন,
—“ঠিক আছে। এবার বলো, এই ডিমটা মুরগি পাড়বে, নাকি হাঁস?”
মজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
—“স্যার, এটা মুরগি বা হাঁস—কেউই পাড়বে না।”
শিক্ষক বললেন,
—“কেন?”
মজিদ হেসে বলল,
—“কারণ ডিমটা আপনি ইতিমধ্যেই হাতে ধরে রেখেছেন!”
শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে ফেললেন।
গ্রামের সবাই বুঝতে পারল, মজিদ আসলে যতটা বুদ্ধিমান দাবি করে, ততটা নয়। কিন্তু তার বুদ্ধির চেয়েও তার মজার কথা বলার ক্ষমতা বেশি।
সেদিন থেকে গ্রামের মানুষ তাকে আর “বুদ্ধিমান মজিদ” বলত না।
সবাই তাকে ডাকত—
“হাসির মজিদ!”
আর মজিদও এতে খুব খুশি ছিল।
সে বলত,
—“বুদ্ধিমান হলে মানুষ ভয় পায়, কিন্তু হাসির মানুষ হলে সবাই কাছে আসে!”
তারপর থেকে মজিদ যখনই কারও হারানো জিনিস খুঁজে দিত, সে আগে একটা কথা বলত—
“জিনিস হারালে ভয় পাবেন না, মজিদের কাছে আসুন। জিনিস না পেলেও অন্তত হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন!”
গ্রামের সবাই হেসে উঠত।
আর মজিদ?
সে মিষ্টির দোকানের দিকে হাঁটত! 😄
শিক্ষা: জীবনে সমস্যা আসবেই। কিন্তু হাসিমুখে সমস্যার মোকাবিলা করলে কঠিন সময়ও অনেক সহজ হয়ে যায়।
0 Comments