Header Ads Widget

অন্ধকারের নীল খাম (গোয়েন্দা গল্প কাহিনী, Bangla Goyenda Golpo Bengali )

অন্ধকারের নীল খাম

কলকাতার পুরোনো উত্তর শহরের এক নিরিবিলি গলিতে থাকত গোয়েন্দা আরিয়ান রায়। মানুষ তাকে “বাংলার শার্লক” বলেই চিনত। লম্বা দেহ, তীক্ষ্ণ চোখ আর অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা—এই তিন জিনিসই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।

এক বর্ষার রাতে আরিয়ানের বাসার দরজায় কড়া নাড়ল এক ভদ্রলোক। তার বয়স প্রায় পঞ্চাশ, চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট।

“আমি দেবাশীষ মুখার্জি,” লোকটি কাঁপা গলায় বলল। “আমার ছোট ভাই নিখোঁজ।”

আরিয়ান ধীরে ধীরে চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
“সব শুরু থেকে বলুন।”

দেবাশীষ জানালেন, তার ভাই অমিত একজন ইতিহাস গবেষক। তিন দিন আগে সে একটি পুরোনো জমিদার বাড়িতে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে শুধু একটি কথাই বলেছিল—

“নীল খামের রহস্য যদি সত্যি হয়, তাহলে বহু পুরোনো এক সত্য প্রকাশ পাবে।”

তারপর থেকেই অমিতের কোনো খোঁজ নেই।

আরিয়ান চুপচাপ শুনছিল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আপনার ভাই কি বামহাতি?”

দেবাশীষ অবাক হয়ে গেলেন।
“হ্যাঁ! কিন্তু আপনি বুঝলেন কীভাবে?”

“আপনার আনা চিঠির খামের ডান পাশে কালি লেগে আছে। সাধারণত বামহাতিরাই এমন দাগ ফেলে।”

পরদিন সকালে আরিয়ান তার সহকারী নীলকে নিয়ে বের হলো নদিয়ার এক পুরোনো জমিদার বাড়ির দিকে। জায়গাটার নাম রায়চৌধুরী ভিলা। প্রায় একশো বছরের পুরোনো সেই বাড়ি অদ্ভুত নীরবতায় ঘেরা।

বাড়ির ফটকে পৌঁছাতেই নীল ফিসফিস করে বলল,
“এখানে সত্যিই মানুষ থাকে?”

“মানুষ থাকে,” আরিয়ান মৃদু হেসে বলল, “কিন্তু সবাই জীবিত নয়।”

ভেতরে ঢুকতেই তাদের সামনে এল এক বৃদ্ধ দারোয়ান। তার চোখে অস্বস্তি।

“আপনারা এখানে কেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

আরিয়ান বলল,
“অমিত মুখার্জি নামে একজন এখানে এসেছিলেন।”

বৃদ্ধ থমকে গেল।
“আমি কিছু জানি না।”

কিন্তু আরিয়ান বুঝে গেল লোকটি মিথ্যা বলছে। কারণ তার কপালে ঘাম জমেছে, অথচ আবহাওয়া ঠান্ডা।

বাড়ির ভেতরটা ধুলোয় ভর্তি। দেয়ালে পুরোনো ছবিগুলো ঝুলছে। হঠাৎ আরিয়ানের চোখ আটকে গেল এক ছবিতে। ছবির কোণায় নীল রঙের ছোট্ট খাম আঁকা।

“নীল,” আরিয়ান বলল, “খেয়াল করেছ? একই প্রতীক।”

নীল জিজ্ঞেস করল,
“মানে?”

“এই খাম শুধু কোনো চিঠি নয়। এটা সংকেত।”

তারা বাড়ির লাইব্রেরিতে ঢুকল। বিশাল ঘরে পুরোনো বইয়ের গন্ধ। একটা টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে একটি ডায়েরি।

আরিয়ান ডায়েরি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল—

“যে নীল খাম খুঁজে পাবে, সে জানবে রায়চৌধুরী পরিবারের শেষ সত্য।”

ঠিক তখনই ওপরে কোথাও ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।

নীল ভয় পেয়ে বলল,
“কে ওখানে?”

আরিয়ান টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। করিডোরের শেষে একটা দরজা আধখোলা। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল মেঝেতে রক্তের দাগ।

নীল কেঁপে উঠল।
“অমিতের কিছু হয়েছে নাকি?”

আরিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে রক্ত পরীক্ষা করল।

“না,” সে শান্ত গলায় বলল, “এটা মানুষের রক্ত নয়।”

“তাহলে?”

“ছাগলের।”

আরিয়ান চারপাশে তাকাল। দেয়ালে আঁচড়ের দাগ। জানালার কাছে কাদা লেগে আছে। সে হঠাৎ জানালার বাইরে তাকাল।

“কেউ আমাদের নজর রাখছে।”

ঠিক তখনই বাইরে ছায়ামূর্তি দৌড়ে পালাল।

দুজন ছুটে বের হলো। বৃষ্টির মধ্যে লোকটাকে অনুসরণ করতে করতে তারা পৌঁছাল বাড়ির পেছনের এক পুরোনো গুদামে।

দরজা খুলতেই ভেতরটা অন্ধকার। হঠাৎ একটি কণ্ঠ শোনা গেল—

“আর এক পা এগোলে মরবেন!”

নীল ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। কিন্তু আরিয়ান শান্ত।

সে বলল,
“আপনি অমিত মুখার্জি।”

অন্ধকার থেকে একজন বেরিয়ে এল। ক্লান্ত, দাড়িভর্তি মুখ।

“আপনি কীভাবে বুঝলেন?”

আরিয়ান হালকা হাসল।
“আপনার জুতার ছাপ লাইব্রেরি পর্যন্ত ছিল। কিন্তু ফেরার ছাপ ছিল না। মানে আপনি এখনও এই বাড়িতেই আছেন।”

অমিত দ্রুত বলল,
“আমার সময় কম। তারা খামটা খুঁজছে।”

“কারা?”

অমিত ফিসফিস করে বলল,
“রায়চৌধুরী পরিবারের উত্তরাধিকারীরা। তারা বহু বছর আগে এক হত্যাকাণ্ড চাপা দিয়েছিল।”

সে পকেট থেকে একটি নীল খাম বের করল।

ঠিক তখনই গুলির শব্দ!

অমিত মাটিতে পড়ে গেল।

নীল চিৎকার করে উঠল।

আরিয়ান দ্রুত আলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে কয়েকজন লোক গুদামে ঢুকল।

“খামটা কোথায়?” একজন গর্জে উঠল।

আরিয়ান নিচু গলায় নীলকে বলল,
“ডান দিকের জানালা।”

দুজন নিঃশব্দে সরে গেল।

বাইরে এসে আরিয়ান খাম খুলল। ভেতরে পুরোনো একটি ছবি আর একটি চিঠি।

চিঠিতে লেখা—

“১৯৭১ সালে জমিদার রুদ্র রায়চৌধুরী নিজের ভাইকে হত্যা করে সম্পত্তি দখল করে।”

নীল বিস্ময়ে বলল,
“তাহলে এতদিন ধরে সত্য লুকানো ছিল?”

আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
“আর সেই সত্য জানত অমিত।”

হঠাৎ পেছন থেকে করতালির শব্দ।

দেবাশীষ মুখার্জি সামনে এগিয়ে এলেন।

“অসাধারণ, মিস্টার আরিয়ান।”

নীল হতভম্ব।
“আপনি!”

দেবাশীষ ঠান্ডা হাসি দিলেন।
“অমিত খুব বেশি জেনে ফেলেছিল। তাই তাকে থামাতে হয়েছে।”

আরিয়ান শান্তভাবে বলল,
“আমি শুরু থেকেই সন্দেহ করেছিলাম।”

“কীভাবে?”

“আপনি বলেছিলেন অমিত নিখোঁজ তিন দিন। কিন্তু তার ঘরের চায়ের কাপ তখনও গরম ছিল। মানে আপনি সেদিনই সেখানে ছিলেন।”

দেবাশীষ বন্দুক তুলল।

“খামটা দিন।”

আরিয়ান ধীরে ধীরে খাম বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ঠিক তখনই পুলিশ চারদিক ঘিরে ফেলল।

ইন্সপেক্টর সেন চিৎকার করলেন,
“বন্দুক ফেলুন!”

দেবাশীষ পালাতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেল।

সব শেষ হওয়ার পর নীল জিজ্ঞেস করল,
“তুমি পুলিশকে আগে থেকেই জানিয়েছিলে?”

আরিয়ান সিগারেট জ্বালিয়ে বলল,
“গোয়েন্দার সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার মস্তিষ্ক নয়, সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া।”

বৃষ্টি ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছিল।

আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল।

“প্রত্যেক রহস্যের পেছনে একটা সত্য লুকিয়ে থাকে, নীল। আর সত্য কখনও চিরকাল অন্ধকারে থাকে না।”

Post a Comment

0 Comments